১৯৭৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নাসার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল একটি ছোট মহাকাশযান, নাম ভয়েজার–১। তখন কেউ কল্পনাও করেনি, এই যন্ত্র একদিন মানব সভ্যতার সবচেয়ে দূরের দূত হয়ে উঠবে। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, তবু ভয়েজার–১ এখনও চলছে, পৃথিবীর তৈরি কোনো বস্তু আগে কখনও এত দূর যায়নি।
প্রথমে এর কাজ ছিল বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের কাছাকাছি যাওয়া, তাদের উপগ্রহগুলোর ছবি তোলা এবং তথ্য পাঠানো। কিন্তু ভয়েজার–১ তার কাজ শেষ করেই থেমে যায়নি। ২০১২ সালে এটি সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পড়ে ইন্টারস্টেলার স্পেসে, যেখানে আর সূর্যের আলো পৌঁছায় না।
আজ ভয়েজার–১ পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫.৫৮ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে পৃথিবীতে সিগন্যাল পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ২৩ ঘণ্টা ৪২ মিনিট । অর্থাৎ, আমরা যখন ভয়েজারের পাঠানো সংকেত পাই, তখন সেটি প্রায় এক দিন আগের খবর। এত বিশাল দূরত্বে থেকেও এটি এখনও কাজ করছে। এখনও আমাদের কাছে রেডিও সংকেত পাঠাচ্ছে, যেন মহাবিশ্বের নীরবতার মধ্যে পৃথিবীর একটিমাত্র কণ্ঠস্বর।
ভয়েজার–১ এর ভেতরে আছে একটি সোনালী রেকর্ড, "Golden Record" যেখানে মানুষের কণ্ঠ, পৃথিবীর শব্দ, শিশুর কান্না, বজ্রপাতের গর্জন, ৫৫টি ভাষায় শুভেচ্ছা বার্তা, এবং বিথোভেন থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের শব্দ পর্যন্ত সংরক্ষিত আছে। প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগানের নেতৃত্বে গঠিত নাসা’র একটি বিশেষ কমিটি গোল্ডেন রেকর্ডে কি কি সংরক্ষিত করা হবে সেই বিষয়বস্তু নির্বাচন করেছিল। গোল্ডেন রেকর্ডের বাইরের পৃষ্ঠে চিত্রভাষায় খোদাই করা রয়েছে রেকর্ডটি বাজানোর নির্দেশাবলী, ১৪টি পালসারের সিগন্যাল ব্যবহার করে আমাদের সূর্যের অবস্থানসূচক ম্যাপ এবং সময় ও দূরত্বের মহাজাগতিক একক হিসেবে হাইড্রোজেন পরমাণুর অতি-সূক্ষ্ম স্পিন-ফ্লিপ ট্রানজিশন ডায়াগ্রাম।
ডিস্কটিতে এনকোড করা হয়েছে ১১৮টি ছবি ও ডায়াগ্রাম - যা পৃথিবীর জীবন, মানুষের শরীরবিদ্যা ও মৌলিক বিজ্ঞানকে তুলে ধরে। এতে যুক্ত রয়েছে প্রাকৃতিক শব্দ (বাতাস, বজ্রপাত, সামুদ্রিক ঢেউ, শিশুর কান্না), এনকোড করা টেক্সট আকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের মহাসচিবের আনুষ্ঠানিক বার্তা এবং ৫৫টি ভাষায় মানবজাতির শুভেচ্ছা বার্তা, যার মধ্যে বাংলা ভাষায় গবেষক ড. সুব্রত মুখার্জি-র কণ্ঠে যুক্ত রয়েছে: "নমস্কার, বিশ্বের শান্তি হোক"। এনকোডেড সংগীতে রয়েছে বাখ, বিথোভেন, চ্যাক বেরির পাশাপাশি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী কেশরবাঈ কেরকরের কণ্ঠে রাগ ভৈরব-এ গাওয়া "জাত কাহাঁ হো" গান এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নানা সংস্কৃতির লোকসংগীত।
রেকর্ডটির প্রলেপে অতি-সূক্ষ্ম পরিমাণের ইউরেনিয়াম ক্লোরাইড যৌগের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম-২৩৮ আইসোটোপ এর আস্তরণ দেওয়া রয়েছে, যা একটি তেজস্ক্রিয় ঘড়ি হিসেবে কাজ করবে, যার তেজস্ক্রিয় ক্ষয় মেপে যেকোনো উন্নত বুদ্ধিমান সভ্যতার এলিয়েন মহাকাশযানটির উৎক্ষেপণের সঠিক সময় বের করতে পারবে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মহাজাগতিক বিকিরণ ও ধূলিকণার প্রভাব সত্ত্বেও এই রেকর্ডটি মহাশূন্যে প্রায় ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) বছর পঠনযোগ্য অবস্থায় টিকে থাকবে।
একদিন যদি কোনো ভিনগ্রহী এলিয়েন সভ্যতা এই গোল্ডেন ডিস্ক পায়, তারা জানতে পারবে - একসময় এই মহাবিশ্বে এক গ্রহে মানুষ ছিল, যারা আকাশের ওপারে এক উন্নত সভ্যতার ভিত্তি গড়েছিলো।
বর্তমানে ভয়েজার–১ এর বিদ্যুৎ শক্তি ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ২০৩০ সালের আগেই এটি পুরোপুরি নিস্তব্ধ হয়ে যাবে। তখন হয়তো আর কোনো সংকেত ফিরবে না পৃথিবীতে, তবু মহাশূন্যে ভাসতে থাকবে এটি - পৃথিবীর দূত হয়ে।
ভয়েজার–১ শুধু এক টুকরো প্রযুক্তি নয়, এটি এক প্রতীক - মানুষের কৌতূহল, সাহস আর অজানাকে ছুঁতে চাওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। কোটি কোটি তারার মাঝে, একা ভেসে চলেছে ভয়েজার–১, যেন মহাবিশ্বের গভীরে হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবীর ডাক পৌঁছে দিচ্ছে অনন্তে।
